মতামত ও বিশ্লেষণ
নতুন বছরের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা: ডিআইইউ শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ (পহেলা পর্ব)

TCTN Photo
নতুন বছর হোক আত্মসমালোচনা, ঐক্য ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বছর
আমার কাছে নতুন বছর মানেই নতুন আশা, নতুন লক্ষ্য আর নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার সাহস। আমি মনে করি নতুন বছর শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদল নয় এটি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার প্রতিশ্রুতি।
আমরা চাই মানসম্মত শিক্ষা আধুনিক গবেষণার সুযোগ এবং দক্ষতা-ভিত্তিক কারিকুলাম। আমাদের স্বপ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতির প্রভাব যেন না থাকে, ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও স্কলারশিপের সুযোগ বৃদ্ধি, পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ।
আমি চাই মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, ন্যায্য মূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হোক।
নতুন বছর হোক আত্মসমালোচনা, ঐক্য ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বছর। ছাত্র-জনতার স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলেই একটি শক্তিশালী, আত্মনির্ভর ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
সজীব বাবু
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ দেখতে চাই
২০২৪ সালের রক্তঝরা আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি বুকে নিয়ে আমরা আরও একটি নতুন বছরে পদার্পণ করছি। এবারের নতুন বছর আমার কাছে গতানুগতিক বছরের মত নয়; বরং এটি চব্বিশের বিপ্লবে অর্জিত ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের এক অগ্নিপরীক্ষার বছর। শহীদের রক্তে রঞ্জিত এই জনপদে দাঁড়িয়ে আমাদের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, আর সেই প্রত্যাশা পূরণের দায়বদ্ধতাও সমানভাবে প্রবল।
আমাদের এই নতুন যাত্রার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল সংস্কার। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও প্রশাসন ব্যবস্থা কোনো নির্দিষ্ট দলের আজ্ঞাবহ হয়ে থাকবে না। সংস্কার হতে হবে এতটাই মৌলিক ও কাঠামোর গভীর থেকে, যেন ভবিষ্যতে আর কখনোই কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিন্দুমাত্র সুযোগ থাকবে না। শাসক নয়, আমরা চাই সেবক প্রশাসন।
তরুণ প্রজন্মের সবচেয়ে বড় অভিশাপ বেকারত্ব। আমি চাই চাকরির বাজারে দলীয় সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি বা ঘুষের কালচার চিরতরে বন্ধ হোক। নিয়োগ হতে হবে কেবলই মেধার ভিত্তিতে। তবে সবাই চাকরি করবে, এমন ভাবনার পরিবর্তনও জরুরি। তরুণরা যাতে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে, সেজন্য রাষ্ট্রকে সহজ শর্তে ঋণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে কারিগরি ও গবেষণানির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার প্রবর্তন এখন সময়ের দাবি, যা আমাদের তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের সাথে পাল্লা দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনে সহায়তা করবে।
শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ নিয়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজনীতি চর্চা তরুণদের গণতান্ত্রিক অধিকার, তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেটা হতে হবে সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও শিক্ষার্থী কল্যাণমূলক। তথাকথিত দলীয় লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি শিক্ষাঙ্গন থেকে সম্পূর্ণ দূর করতে হবে, যা অতীতে কেবল সংঘাতই বাড়িয়েছে। পাশাপাশি, সামাজিক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে আমাদের হতে হবে সহনশীল। ভিন্নমত দমনে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধ হামলার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একে অপরের মত শোনার ও শ্রদ্ধা করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। সংবাদমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সত্য তুলে ধরার পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ছাড়া কোনো বিপ্লবই সফল হয় না। দেশের অর্থনীতিতে গেড়ে বসা অবৈধ সিন্ডিকেটগুলো ভেঙে দিতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দাম কমিয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার নাগালে আনা রাষ্ট্রের আশু কর্তব্য। অর্থনৈতিক স্বস্তি না মিললে স্বাধীনতার স্বাদ সাধারণ মানুষের কাছে ফিকে হয়ে যাবে।
সর্বোপরি, ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়—সেটিই এখন ছাত্রজনতার মূল লক্ষ্য। সামনে জাতীয় নির্বাচন আসছে। জনগণের ভোটে ভবিষ্যতে যেই সরকার দেশের হাল ধরুক না কেন, তাদের প্রতি মানুষের পাহাড়সম আকাঙ্ক্ষা থাকবে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণে তাদের ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে মনে রাখা প্রয়োজন—এটি একটি বড় গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়। ভবিষ্যৎ নির্বাচিত সরকার যদি গণমানুষের পালস বা মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হয়, তবে ইতিহাসে হয়তো আবারও কোনো গণঅভ্যুত্থান বারবার ফিরে আসবে। তাই নতুন বছরে প্রত্যাশা এটুকুই—শহীদের রক্তে কেনা এই স্বাধীনতা ও সংস্কারের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আমরা যেন একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়তে পারি।
মাহাতাব হোসেন মাহিম
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
নতুন বিষয় শিখতে চাই
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে নতুন বছরের আগমন আমার কাছে একই সঙ্গে আনন্দ ও দুঃখের অনুভূতি নিয়ে আসে। কারণ একটি বছর শেষ হলে আমাদের স্মৃতিতে বছরের বিগত দিনগুলোর সফলতা ব্যার্থতা ভেসে উঠে। অবচেতন মনে পুরোনো দিনগুলোর পাওয়া–না–পাওয়ার একটি হিসাব চলতে থাকে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী নই, কারণ আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় আমরা নানা ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছি। নতুন বছরে আমার একটি আশা হলো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে উঠবে।
আমি উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বিদেশের কোনো স্বনামধন্য বিদ্যাপীঠে পড়াশোনা করতে আগ্রহী। সে লক্ষ্যে পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হতে চাই। নতুন নতুন বিষয় শিখতে চাই এবং নানা নতুন জায়গা ঘুরে দেখার স্বপ্ন দেখি। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের জীবনের গল্পের সঙ্গে মিশে যেতে চাই।
সিফাত সরকার অন্তু
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি






